পরিমাপ

যে আদর্শ পরিমাপের সাথে তুলনা করে ভৌত রাশিকে পরিমাপ করা হয় তাকে, পরিমাপের একক বলা হয়।

কোন ভৌত রাশি পরিমাপের জন্য দুইটি জিনিসের প্রয়োজন হয়। একটি হল রাশিটির মান এবং অন্যটি একক। পরিমাপের একক মানব সভ্যতার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। কারণ মানুষ প্রথমত এই এককগুলোর মাধ্যমেই পরিমাপ ব্যবস্থার সৃষ্টি করেছিল এবং এর প্রয়োজনেই সৃষ্টি হয়েছিল গণিতের, আর গণিতের মাধ্যমেই বিজ্ঞানের ভিত্তি স্থাপিত হয়েছে।

এককের বিভিন্ন পদ্ধতি (Different systems of Units) :  বর্তমানে প্রধানত দুটি পদ্ধতিতে সকল ভৌতরাশির একক প্রকাশ করা হয়ে থাকে । যথা – (i) সেন্টিমিটার গ্রাম সেকেন্ড বা cgs পদ্ধতি (cgs system) , (ii) আন্তর্জাতিক পদ্ধতি বা SI পদ্ধতি ( system de International or SI system )
(i) সেন্টিমিটার গ্রাম সেকেন্ড বা cgs পদ্ধতি (cgs system) :- এই পদ্ধতি অনুসারে কেবল মাত্র দৈর্ঘ্য, ভর এবং সময় এই তিনটি ভৌতরাশির একককেই মূল একক ধরা হয় ।
(ii) আন্তর্জাতিক পদ্ধতি বা SI পদ্ধতি ( system de International or SI system ) :- পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন ভৌতরাশির পরিমাপ প্রকাশে অভিন্নতা আনার জন্য 1960 সালে সর্বজনগ্রাহ্য একটি পদ্ধতির প্রচলন করা হয় । একেই আন্তর্জাতিক বা SI পদ্ধতি বলা হয় । বর্তমানে এই পদ্ধতিটির ব্যবহার বহুল । এই পদ্ধতি অনুসারে দৈর্ঘ্য, ভর, এবং সময়ের এককের সঙ্গে উষ্ণতা, তড়িৎপ্রবাহ মাত্রা, দীপনপ্রাবল্য, পদার্থের পরিমাণ এদের একককেও মূল একক ধরা হয় ।
(iii) এ ছাড়াও পৃথিবীতে অন্যতম একক বহুল প্রচলিত আছে, তাহলো ব্রিটিশ একক যা সংক্ষেপে, fps method নামে প্রচলিত।
SI পদ্ধতিতে মূল এককগুলির নাম এবং এদের চিহ্ন নীচের ছকে দেখানো হল :
 রাশিএককচিহ্ন
1.দৈর্ঘ্যমিটারm
2.ভরকিলোগ্রামkg
3.উষ্ণতাকেলভিনk
4.সময়সেকেন্ডs
5.তড়িৎপ্রবাহমাত্রাঅ্যাম্পিয়ারA
6.দীপনপ্রাবল্যক্যান্ডেলাcd
7.পদার্থের পরিমাণমোলmol
এছাড়া কোণের একক রেডিয়ান (c) এবং ঘনকোণের একক স্টেরেডিয়ান (sd) – কেও মূল একক ধরা হয় । cgs এবং SI এই দুটি পদ্ধতিকে একত্রে মেট্রিক বা দশমিক পদ্ধতি বলা হয় । এই দুটি পদ্ধতিতে যে-কোনো একক থেকে ছোটো বা বড়ো এককে যেতে হলে দশমিক বিন্দুকে প্রয়োজনমত ডান দিকে বা বাম দিকে সরালেই চলে ।

সকল ভৌতরাশির একক হয় না কারণ কোনো কোনো ভৌতরাশির পরিমাপ প্রকাশে এককের প্রয়োজন হয় না । যে সকল ভৌতরাশি দুটি সমজাতীয় ভৌতরাশির অনুপাত হিসাবে প্রকাশিত হয় তাদের একক থাকে না । যেমন – পারমাণবিক বা আণবিক গুরুত্ব । এরা দুটি ভরের অনুপাত হওয়ায় এককগুলি কেটে যায় । অনুরূপে আপেক্ষিক গুরুত্ব (দুটি ঘনত্বের অনুপাত), আপেক্ষিক আর্দ্রতা (দুটি ভরের অনুপাত), স্থিতিস্থাপক বিকৃতি (দুটি দৈর্ঘ্য বা আয়তনের অনুপাত), যন্ত্রের যান্ত্রিক সুবিধা (দুটি বলের অনুপাত) – এদের কোনো একক নেই ।
মৌলিক এবং লব্ধ একক (Fundamental and derived units) : বিজ্ঞানে অসংখ্য ভৌতরাশি আছে যাদের একক বর্তমান । রাশি অসংখ্য হলেও এদের পরিমাপের একক মাত্র অল্প সংখ্যক রাশির এককের উপযুক্ত সমন্বয়ে গঠন করা সম্ভব । একক দু’প্রকার –
(i) মৌলিক একক বা প্রাথমিক একক (Fundamental units) এবং (ii) লব্ধ একক (Derived units)।
মৌলিক একক বা প্রাথমিক একক (Fundamental units) :- যে সমস্ত ভৌত রাশির একক পরস্পরের উপর নির্ভরশীল নয়, অর্থাৎ স্বাধীনভাবে গঠন করা হয়েছে এবং যাদের সাহায্যে অন্যান্য ভৌত রাশির একক গঠন করা যায় সেই সমস্ত ভৌত রাশির এককগুলিকে মৌলিক একক বা প্রাথমিক একক বলা হয় । যেমন – দৈর্ঘ্যের একক (মি), ভরের একক (কিগ্রা) ইত্যাদি । যে সকল রাশির একক মৌলিক তাদের ‘মৌলিক রাশি’ বলে । ভর, দৈর্ঘ্য ও সময় মৌলিক রাশি ।
লব্ধ একক (Derived units) :- যে সমত ভৌত রাশির একক, এক বা একাধিক (সমজাতীয় বা ভিন্ন জাতীয়) মৌলিক এককের সাহায্য নিয়ে গঠিত হয়, সেই সমস্ত ভৌত রাশির এককগুলিকে লব্ধ একক বলা হয় । যেমন- ক্ষেত্রফলের একক (বর্গ সেমি), বেগের একক (কিমি / ঘন্টা) ইত্যাদি । যে সকল রাশির একক লব্ধ একক তাদের লব্ধ রাশি বলে । ক্ষেত্রফল, বেগ এগুলি লব্ধ রাশি ।
একটি মৌলিক একককে একবার ব্যবহার করেও লব্ধ একক পাওয়া যেতে পারে । যেমন, সময়ের একক সেকেন্ড (s) । এটি মৌলিক একক । আবার কম্পাঙ্কের একক হার্ৎজ (s-1 ) । এটি লব্ধ একক ।
একই মৌলিক একককে একাধিক ব্যবহার করে লব্ধ একক পাওয়া যায় । যেমন, ক্ষেত্রফলের একক (m2) এবং আয়তনের একক (m3) । ক্ষেত্রফলের এককে দুটি দৈর্ঘ্যের এককের এবং এবং আয়তনের এককে তিনটি দৈর্ঘ্যের এককের সমন্বয় ঘটেছে ।
ভিন্ন মৌলিক এককের সমন্বয়ে গঠিত লব্ধ এককের উদাহরণ হল বেগের একক (ms-1), ভরবেগের একক (kgms-1) ইত্যাদি । বেগের এককে দৈর্ঘ্যের একক (m) এবং সময়ের একক (s) –এর সমন্বয় ঘটেছে । ভরবেগের এককে ভরের একক (kg), দৈর্ঘ্যের একক (m) এবং সময়ের একক (s)- এর সমন্বয় ঘটেছে ।
SI পদ্ধতিতে কয়েকটি লব্ধ এককের নাম ও সাংকেতিক চিহ্ন দেওয়া হল ।
 রাশিএককসাংকেতিক চিহ্ন
1.ক্ষেত্রফলবর্গমিটারm2
2.আয়তনঘনমিটারm3
3.ঘনত্বকিলোগ্রাম /ঘনমিটারkgm-3
4.বেগ / দ্রুতিমিটার / সেকেন্ডms-1
5.ত্বরণ / মন্দনমিটার / সেকেন্ড2ms-2
6.ভরবেগকিলোগ্রাম মি / সেkg ms-1
7.বলনিউটনN
8.চাপপাস্কালPa
9.কার্য / শক্তিজুলJ
10.ক্ষমতাওয়াটW
■ প্রমাণ দৈর্ঘ্য ও প্রমাণ সময়ের আধুনিক ধারণা (Modern concept of standard length and standard time) : SI পদ্ধতিতে দৈর্ঘ্যের একক হল মিটার ।
আধুনিক সংজ্ঞা : 1967 সালে গৃহীত সংজ্ঞা 86 ভরসংখ্যা বিশিষ্ট ক্রিপটন (Kr86) গ্যাস উদ্দীপ্ত অবস্থায় শূন্য মাধ্যমে কমলা-লাল বর্ণের যে আলো বিকিরণ করে ওই আলোর তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের (তরঙ্গের গতিপথে পরপর দুটি সমদশা অর্থাৎ একই রকম গতির অবস্থা যুক্ত বিন্দুর মধ্যবর্তী দুরত্ব ) 1650763.75 গুণ দৈর্ঘ্যকে 1 মিটার দৈর্ঘ্য ধরা হয় ।
1983 সালে গৃহীত সংজ্ঞা শূন্য মাধ্যমে 12.9979×108 সেকেন্ড সময়ে আলো যে দূরত্ব অতিক্রম করে তাকে 1 মিটার ধরা হয় ।
মিটারের ভগ্নাংশ বা গুণিতাংশ ব্যবহার করে ছোটো বা বড়ো দৈর্ঘ্যের একক পাওয়া যায় ।
SI পদ্ধতিতে সময়ের একক সেকেন্ড ।
আধুনিক সংজ্ঞা : প্রমাণ চৌম্বকক্ষেত্রে অবস্থিত তেজষ্ক্রিয় সিজিয়াম (Cs133) পরমাণুর 9, 192, 631, 770 সংখ্যক পূর্ণ অভ্যন্তরীণ স্পন্দনের (রৈখিক পথে নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে যে গতির পুনরাবৃত্তি ঘটে) জন্য প্রয়োজনীয় সময়কে 1 সেকেন্ড ধরা হয় ।
সেকেন্ডর ভগ্নাংশ বা গুণিতাংশ ব্যবহার করে ছোটো বা বড়ো সময়ের একক পাওয়া যায় ।
■ ভরের একক (units of Mass) : কোনো বস্তুতে উপস্থিত জড় পদার্থের পরিমাণকে তার ভর বলা হয় । cgs পদ্ধতিতে ভরের একক গ্রাম (g) এবং SI পদ্ধতিতে ভরের একক কিলোগ্রাম (kg) ।
কিলোগ্রাম : ফ্রান্সের প্যারিস শহরে 'আন্তর্জাতিক ব্যুরো অফ ওয়েটস অ্যান্ড মেজার্স' -এর দপ্তরে রাখা প্ল্যাটিনাম ও ইরিডিয়াম সংকর ধাতুর তৈরি একটি নিরেট চোঙের ভরকে 1 কিলোগ্রাম (kg) ধরা হয় ।
কিলোগ্রামের নতুন সংজ্ঞা হবেএক কিলোগ্রাম ভর হবে সেই ভর যার মাধ্যমে প্ল্যাংকের ধ্রুবক h এর মান হবে 6.62607015 X 10-34 J.s বা kg.m2.s-1 যেখানে মিটার ও সেকেন্ড মাপা হবে তাদের নিজ নিজ আদর্শ সংজ্ঞা থেকে।  অর্থাৎ মিটার মাপা হবে আলোর বেগ থেকে এবং সেকেন্ড মাপা হবে সিজিয়াম-১৩৩ পরমাণুর বিকিরণ থেকে।
গ্রাম : এক কিলোগ্রামের এক হাজার ভাগের এক ভাগকে 1 গ্রাম বলে । আবার 4°C উষ্ণতায় 1 ঘন সেন্টিমিটার আয়তনের বিশুদ্ধ জলের ভরকেও 1 গ্রাম বলা হয় ।
কিলোগ্রামের ভগ্নাংশ বা গুণিতাংশ ব্যবহার করে অনেক ছোটো বা বড়ো ভরের একক পাওয়া যায় ।
■ আয়তনের একক (Units of Volume) : কোনো বস্তু যে পরিমাণ স্থান দখল করে থাকে সেটাই তার আয়তন । cgs পদ্ধতিতে আয়তনের একক হল ঘন সেন্টিমিটার (cm3) এবং SI পদ্ধতিতে আয়তনের একক হল ঘনমিটার (m3) ।
■ ঘন সেন্টিমিটার : 1 সেন্টিমিটার বাহু বিশিষ্ট কোনো ঘনকের আয়তনকে 1 ঘন সেন্টিমিটার বলে ।
■ ঘন মিটার : 1 মিটার বাহু বিশিষ্ট কোনো ঘনকের আয়তনকে 1 ঘন মিটার বলে ।

Comments

Popular Posts